Hits: 11
ডা.প্রদীপ কুমার দাস
সম্প্রতি উত্তরবঙ্গের বেশ কয়েকটি হাসপাতালে ও কেরলের অনেকগুলি হাসপাতালে জ্বর, মাথার যন্ত্রণা, গায়ে-হাত-পায়ে প্রচন্ড ব্যথা, উদরাময় নিয়ে অনেকেই ভর্তি হচ্ছেন। কেউ কেউ মারাও গেছেন। কিন্তু জ্বরের কারণ নিয়ে চিকিৎসকেরা সন্দিহান। অজানা জ্বর বলে চিহ্নিত করা হচ্ছে। এরাজ্যের অনেক জেলাতেও এ ধরণের অজানা জ্বরের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে। কেউ কেউ করোনা সংক্রমণের তৃতীয় ঢেউ এর সম্ভাবনার সঙ্গে মেলাতে চাইছেন। কিন্তু তেমন অকাট্য প্রমাণ হাতে আসে নি এখনো চিকিৎসকদের হাতে।চিকিৎসকদের মতানুযায়ী এই অজানা জ্বরের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে যেগুলির কথা ভাবা হয় সেগুলি হল কোনো সংক্রমণ যেমন মূত্রনালীতে সংক্রমণ, শ্বাসনালীতে বিশেষ করে যক্ষ্মারোগ, হৃদযন্ত্রের সংক্রমণ, দেহের অভ্যন্তরে কোথাও লুক্কায়িত জমে থাকা পুঁজ রক্ত রস এছাড়া ভাবা হয় দেহের মধ্যে কোথাও ক্যানসার হওয়ার সম্ভাবনা যেমন লিম্ফোমা অথবা লিউকোমিয়ার কথা, দেহের সংযোজক কলার অসুখ বিশেষ করে এস -এল- ই, রিউম্যাটয়েড আর্থারাইটিস, টেমপোরাল আর্থারাইটিস ইত্যাদি বিবিধ অসুখের কথা ও দেহের প্রতিরোধ ব্যবস্থা যেখানে ভেঙে পড়ে বিশেষ করে এইচআইভি সংক্রমণ, ফুসফুস ছাড়া দেহের অন্য কোনো স্থানে যক্ষ্মা রোগের আক্রমণ, কিছু ছত্রাকজাতীয় সংক্রমণ যেমন হিস্টোপ্লাজমোসিস, কক্সিডিও মাইকোসিম, সারকোয়ডোসিসের কথা ভাবা হয় অজানা জ্বরের কারণ হিসেবে। এ ছাড়া বেশ কিছু ভাইরাল সংক্রমণ যেমন এবস্টেম ভাইরাস, সাইটোমেগালো ভাইরাসের সংক্রমণে অজানা জ্বরের কারণ হতে পারে। দেহের মধ্যে কোনো ক্যানসার বিশেষ করে কোলনে, যকৃতে, লসিকাগ্রন্থিতে, রক্তের শ্বেতকণিকাতে, প্রস্টেট গ্রন্থিতে কিডনিতে ক্যানসার হলে অজানা জ্বরের সমস্ত লক্ষণ দেখা যায়। কিছু ওষুধ আবার অজানা জ্বরের কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়। এছাড়া পরজীবী সংক্রমণ যেমন ম্যালেরিয়া,কালাজ্বর, ডেঙ্গু, চিকেনগুনিয়া, কৃমির সংক্রমণের জন্য অজানা দেখা দিতে পারে। বিগত দিনে ও সম্প্রতি বারাসাত হাসপাতালে দুজন সেবিকা ও একজন মেল নার্স নিপা ভাইরাস সংক্রমণের দাপটে চিকিৎসাধীন। এই ভাইরাসের সংক্রমণ হয় পশুপাখি থেকে। পরে মানুষ থেকে মানুষের মধ্যে সংক্রমণ ছড়ায়। এই ভাইরাস প্রথম ধরা পড়ে মালয়েশিয়া থেকে ঊনিশশো আটানব্বই সালে। পরে সিঙ্গাপুরে ধরা পড়ে উনিশশো নিরানব্বই সালে। এর পরে বিভিন্ন দেশ যেমন থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, ঘানা ও ফিলিপাইন্সে এই ভাইরাসের সংক্রমণ ঘটতে দেখা যায়। বাংলাদেশে দুই হাজার এক সালে ভাইরাসের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। ভারতবর্ষ ও বাংলাদেশে যে সমস্ত ফল খাওয়া বাদুড়েরা তালের রস খেতে আসে সেখান থেকে তাদের প্রস্রাব ও লালারসের মিশে মানুষের দেহে চলে আসে কাঁচা তালের রস খাওয়ার ফলে। শুধু তাই নয় কাঁচা যে কোনো ফলের মাধ্যমেও এই ভাইরাস সংক্রমিত করে কাঁচা ফল খেকো বাদুড়েরা। এছাড়া এই ভাইরাস ছড়ানোর জন্য দায়ী হল গৃহপালিত জন্তু যেমন শুয়োর, ঘোড়া, ছাগল, ভেড়া, বিড়াল ও কুকুর। ঊনিশ আটানব্বই সালে মালয়েশিয়ায় যখন প্রথম সংক্রমণ ধরা পড়ে তখন শুয়োরের মধ্যে ভাইরাসের বাড়বাড়ন্ত লক্ষ্য করা গিয়েছিল। সেখান থেকে প্রায় তিনশো জন এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল। এদের মধ্যে মারা গিয়েছিল প্রায় একশো জন। দুই হাজার চার সালে বাংলাদেশে ব্যাপকহারে যখন এই নিপা ভাইরাসের সংক্রমণ ঘটেছিল, সেসময়েও দায়ী ছিল ফল খেকো বাদুড়েরা। বাংলাদেশে নিপা ভাইরাসের সংক্রমণ ঘটেছিল দুই হাজার চার সাল থেকে দুই হাজার এগারো সালে বিভিন্ন জায়গায়। এদেশে শিলিগুড়িতে ওই ভাইরাস সংক্রমণের জন্য দায়ী ছিল ওই ফল খোকো বাদুড়েরা। নিপা ভাইরাস সংক্রমণের ফলে যে সমস্ত লক্ষণগুলি দেখা যায় সেগুলো হলো ধুম জ্বর, মাথার যন্ত্রণা, আচ্ছন্ন ভাব, ভুল বকা, বমি, হাতে পায়ে ব্যথার সঙ্গে উত্তরোত্তর জ্বর বাড়তে থাকা ও এনকেফালাইটিসের সব লক্ষ্মণগুলো এসে দেখা দিতে থাকে। কখনো কখনো নিউমোনিয়া বা শ্বাসকষ্ট দেখা দেয় এবং এর পরেই খিঁচুনিসহ কোমায় চলে যায়। তবে যে সমস্ত রোগীরা এর পরেও বেঁচে যায় তাঁদের ক্ষেত্রে পুরোপুরি স্বাভাবিকতা সব ক্ষেত্রেই ফিরে আসে না। কুড়ি শতাংশ ক্ষেত্রে স্নায়ুঘটিত দুর্বলতা থেকেই যায়। এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার পরে মৃত্যুর হার চল্লিশ থেকে পঁচাত্তর শতাংশ, কেননা এ রোগের যথাযথ কোনো ওষুধ আজও পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়নি। সবটাই লক্ষণভিত্তিক এবং সাপোর্টিভ চিকিৎসা করা হয়। এই রোগের বিরুদ্ধে আজ পর্যন্ত কোনো টিকা বা ভ্যাকসিন বের হয়নি। সতর্কতার সঙ্গে রোগীদের পরিচর্যা করতে হয়। কাঁচা ফল খাওয়া চলবে না। পাকা ফল ভালো করে ধুয়ে নিতে হবে। খামারে পশুপাখিদের শুশ্রুষা করার প্রয়োজন হলে হাতে ফুল গ্লাভস ও অন্যান্য প্রতিরোধক জামাকাপড় পরে ওদের গায়ে হাত দিতে হবে, ওদেরকে পরিচর্যা করতে হবে। রোগীদের পরীক্ষা করার পরে সবসমই হাত ভালো করে ধুয়ে নেওয়া প্রয়োজন। ভয় পেলে চলবে না, শুধু দরকার সদা সতর্ক মনোভাব এবং কড়া নজরদারি।
তাই যেকোনো জ্বর বেশিদিন ধরে চলতে থাকলে যাকে আমরা ‘অজানা জ্বর’ বলে থাকি সেটা আমাদের কাছে অযথা ভয়ের ও আতঙ্কের সৃষ্টি করে। চিকিৎসকদের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। পরিবারের কাছে ব্যয়সাধ্য সমস্যা হয়ে পড়ে। তবুও এই সমস্যার জন্য আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। বর্তমানে চিকিৎসাশাস্ত্রের প্রভূত উন্নতি ও অত্যাধুনিক প্রযুক্তির দৌলতে অনেক অজানাই জানার খবর এসে পৌঁছেছে। তাই আমাদের দরকার সহিষ্ণুতা, ধৈর্য্য ও চিকিৎসাশাস্ত্রের প্রতি বিশ্বাস এবং নির্ভরযোগ্য মনোভাব পোষণ।


