শ্রীরামপুরে বহু প্রতীক্ষিত সিল্ক হাব প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক সূচনা

Hits: 0

রাখী সাহা : প্রভাসনগর এলাকায় দীর্ঘদিনের জমিজট কাটিয়ে ভূমিপুজোর মাধ্যমে শিলান্যাস ও ইটের গাঁথনি শুরু হওয়ায় স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী থেকে সাধারণ মানুষ। শ্রীরামপুরের সাংসদ কল্যাণ ব্যানার্জী-র হাত ধরে এদিন প্রকল্পের উদ্বোধন হয়। উপস্থিত ছিলেন চাপদানীর বিধায়ক অরিন্দম গুঁইন-সহ স্থানীয় প্রশাসনিক কর্তারা ও বিশিষ্টজনেরা।

প্রভাসনগরের এই সিল্ক হাবকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই প্রত্যাশা ছিল এলাকাবাসীর। শ্রীরামপুর ও আশপাশের অঞ্চলে ছোট-বড় বহু সিল্ক ব্যবসায়ী ও তাঁতশিল্পী রয়েছেন। কিন্তু আধুনিক বিপণন কাঠামো ও কেন্দ্রীয় প্রদর্শনী ব্যবস্থার অভাবে তাঁরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছিলেন। সেই প্রেক্ষাপটে একটি সমন্বিত সিল্ক হাব তৈরির দাবি বহুদিনের। নানা প্রশাসনিক জটিলতা, বিশেষত জমি সংক্রান্ত সমস্যার কারণে প্রকল্পটি বারবার থমকে গিয়েছিল। ফলে হতাশা তৈরি হয়েছিল ব্যবসায়ী মহলে। অবশেষে সেই জট কাটিয়ে কাজ শুরু হওয়ায় নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সাংসদ কল্যাণ ব্যানার্জী বলেন, এই প্রকল্প শুধু একটি ভবন নির্মাণ নয়, এটি একটি অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলার প্রচেষ্টা। তাঁর কথায়, স্থানীয় শিল্পকে বাঁচাতে ও নতুন প্রজন্মকে এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত রাখতে অবকাঠামোগত উন্নয়ন অত্যন্ত জরুরি। তিনি জানান, প্রশাসনের সক্রিয় হস্তক্ষেপে জমিজট মেটানো সম্ভব হয়েছে এবং দ্রুত সময়ের মধ্যে নির্মাণ কাজ সম্পূর্ণ করার লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে।

চাঁপদানীর বিধায়ক অরিন্দম গুঁইনও বক্তব্য রাখতে গিয়ে বলেন, প্রভাসনগরের এই সিল্ক হাব ভবিষ্যতে জেলার অন্যতম বাণিজ্যিক কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। তিনি দাবি করেন, স্থানীয় শিল্প ও ব্যবসার প্রসারে রাজ্য সরকারের উদ্যোগ ধারাবাহিকভাবে চলছে এবং এই প্রকল্প সেই ধারারই অংশ।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রস্তাবিত সিল্ক হাবে থাকবে প্রদর্শনী কক্ষ, পাইকারি ও খুচরো বিপণনের আলাদা ব্যবস্থা, গুদামজাতকরণ পরিকাঠামো এবং প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। বিশেষ করে নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য প্রশিক্ষণ ও বিপণন সহায়তার ব্যবস্থা থাকলে শিল্পের পরিসর আরও বাড়বে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এতে একদিকে যেমন ঐতিহ্যবাহী সিল্ক শিল্পের প্রসার ঘটবে, তেমনি কর্মসংস্থানেরও সুযোগ তৈরি হবে।

প্রভাসনগর ও আশপাশের এলাকার বাসিন্দাদের মতে, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ছোট ব্যবসায়ীরা সরাসরি ক্রেতাদের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাবেন। এতদিন তাঁদের অনেকেই মধ্যস্বত্বভোগীদের উপর নির্ভরশীল ছিলেন। একটি কেন্দ্রীয় হাব তৈরি হলে বাজার সম্প্রসারণ সহজ হবে এবং পণ্যের ন্যায্য মূল্য পাওয়ার সম্ভাবনাও বাড়বে।

তবে বিরোধী মহলের একাংশের প্রশ্ন, শিলান্যাসের পর কত দ্রুত কাজ এগোবে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্প শেষ করা যাবে কি না। অতীতে বহু প্রকল্পের কাজ দেরিতে সম্পূর্ণ হওয়ার নজির রয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা যেমন উঁচু, তেমনই সংশয়ও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। এই পরিস্থিতিতে প্রশাসনের উপর দায়িত্ব বাড়ছে—ঘোষণার সঙ্গে বাস্তবায়নের ফারাক যেন না থাকে।

অর্থনৈতিক দিক থেকে বিচার করলে, একটি সিল্ক হাব কেবল বাণিজ্যিক পরিকাঠামো নয়; এটি হতে পারে আঞ্চলিক অর্থনীতির চালিকাশক্তি। স্থানীয় উৎপাদন, পরিবহণ, বিপণন—সব ক্ষেত্রেই গতি আসতে পারে। পাশাপাশি পর্যটন সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে, যদি এটিকে একটি ব্র্যান্ডেড সিল্ক মার্কেট হিসেবে গড়ে তোলা যায়। পশ্চিমবঙ্গের সিল্ক শিল্প ঐতিহ্যগতভাবে সমৃদ্ধ, কিন্তু আধুনিক বাজারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার জন্য প্রয়োজন সংগঠিত অবকাঠামো। সেই জায়গায় এই প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।

ভূমিপুজোর মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়ে গেলেও এখন নজর থাকবে কাজের গতির উপর। স্থানীয়দের আশা, বহু প্রতীক্ষিত এই সিল্ক হাব দ্রুত বাস্তব রূপ নেবে এবং প্রভাসনগর নতুন অর্থনৈতিক পরিচয়ে আত্মপ্রকাশ করবে। রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির বাইরে গিয়ে প্রকল্পটি যদি সময়মতো সম্পূর্ণ হয়, তবে তা শুধু একটি এলাকার উন্নয়ন নয়—পুরো অঞ্চলের শিল্পচর্চায় নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে। এখন দেখার, এই আশার আলো কত দ্রুত বাস্তবে রূপ পায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *